আঞ্চলিক ও জোটভিত্তিক মেরুকরণ, বাণিজ্য উত্তেজনা ও শুল্ক বিবাদসহ বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ বৈশ্বিক বিনিয়োগকে নতুন রূপ দিচ্ছে। মূলত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নতুন নতুন বিকল্প যাচাই করছেন বিনিয়োগকারীরা। এতে বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনতে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের বাজার বেছে নিয়েছে তারা, যাতে প্রাধান্য পাচ্ছে এশিয়ার দেশগুলো। ক্রমবর্ধমান এ প্রবণতায় চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) চীন বাদ দিয়ে এ মহাদেশের দেশগুলোয় প্রায় ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ডলারের পুঁজিপ্রবাহ ঘটেছে বলে জানিয়েছেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের এশিয়া-প্যাসিফিক (জাপান বাদে) অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট কেভিন স্নিডার। খবর রয়টার্স।
এশিয়ায় পুঁজিপ্রবাহের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি, ভোক্তাপণ্য ও শিল্প খাতে বিনিয়োগকারীদের বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে।
সিঙ্গাপুরে ‘মিলকেন ইনস্টিটিউট এশিয়া সামিট ২০২৫’-এ অংশ নিয়ে গতকাল শত বিলিয়ন ডলারের পুঁজিপ্রবাহের এ তথ্য দেন কেভিন স্নিডার। তিনি জানান, বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিনিয়োগ বৈচিত্র্য আনার কৌশল যোগ করছেন পোর্টফোলিওতে। তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বড় আকারের বিনিয়োগে।
নতুন বিনিয়োগ বৃদ্ধির অর্থ এমন নয় যে বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্র্ ছেড়ে এশিয়ার দিকে নজর দিচ্ছেন বলে জানান কেভিন স্নিডার। বরং তারা পোর্টফোলিওতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা তৈরিতে এশিয়ার প্রতিষ্ঠিত ও উদীয়মান বাজারকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। কেভিন স্নিডার বলেন, ‘এ অঞ্চলে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ দেখা যাচ্ছে। আমি মনে করি, একে বিনিয়োগ বৈচিত্র্যকরণের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা জরুরি। কোনো ধরনের বহির্গমন বা এক্সিট মুভমেন্ট হিসেবে দেখা যাবে না।’
এ প্রবণতায় এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি জাপান সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হয়েছে বলে জানান কেভিন স্নিডার। অন্যদিকে চীনের শেয়ারবাজারে গত বছরের শেষ দিক থেকে যে উত্থান দেখা গেছে, তা মূলত দেশীয় বিনিয়োগকারী ও প্রযুক্তি খাতকেন্দ্রিক আগ্রহের কারণে। তবে বিদেশী তহবিলগুলো এখন আবার চীনের বাজারের দিকে নজর দিচ্ছে।
চীনা পুঁজিবাজার নিয়ে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সাম্প্রতিক আগ্রহ সম্পর্কে গত মাসে এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মূলত দেশটিতে বিনিয়োগ নীতিমালার শিথিলীকরণ ও সহজীকরণ, প্রযুক্তি খাতে নতুন উদ্ভাবন এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মার্কিন সম্পদের বাইরে বিনিয়োগ বৈচিত্র্যায়ণের ক্রমবর্ধমান চাহিদার মতো বিষয়গুলো প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্যমতে, চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ ও ওয়াশিংটনের প্রযুক্তি রফতানি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনে উদ্ভাবন থেমে যায়নি। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ার পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর ও উদ্ভাবনী ওষুধ শিল্পে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অগ্রগতি দেখিয়েছে চীন এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করেছে দেশটি।
এশিয়ায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগপ্রবাহের নতুন এ প্রবণতা নিয়ে সতর্কবার্তাও দিয়েছেন গোল্ডম্যান স্যাকসের কেভিন স্নিডার। তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত এবং অতিরিক্ত উচ্ছ্বসিত হওয়া উচিত নয়। কারণ এ অর্থের একটি অংশ হলো গ্লোবাল হেজ ফান্ড মানি বা দ্রুত প্রবাহিত হওয়া পুঁজি।’
বিষয়টি কেভিন স্নিডার ব্যাখ্যা করেন এভাবে, ‘তহবিলগুলো এখনো তাদের গড় হোল্ডিংয়ের প্রায় ৬০-৬৫ শতাংশের মধ্যে কাজ করছে। এটা ১০০ শতাংশ নয়, তাই তারা আগের পর্যায়ে ফেরেনি। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী, যেমন মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর অর্থ এখনো চীনে ফিরছে না। তবে তারা অবশ্যই এশিয়াকে নতুন করে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।’
গত নয় মাসে এশিয়ার প্রযুক্তি, ভোক্তা ব্যয়নির্ভর পণ্য ও শিল্প খাতে শক্তিশালী বিনিয়োগপ্রবাহ লক্ষ করা যাচ্ছে। এছাড়া ব্যক্তিগত পরিষেবার বাজারে স্বাস্থ্য খাত বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।
একই অনুষ্ঠানে অর্থনৈতিক মেরুকরণের বর্তমান চিত্র উঠে আসে সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা টেমাসেক ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী দিলহান পিল্লাইয়ের কথায়। তিনি বলেন, ‘যে ধাঁচে আমরা এতদিন বিশ্বায়নকে চিনতাম, তা আর নেই।’
কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, শুল্কবিবাদ ও জ্বালানি সরবরাহে বিভিন্ন ধরনের বাধা ব্যবসায়িক আয়কে নতুন আকার দিচ্ছে।
তার মতে, নতুন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের পুনর্বিন্যাস ঘটছে। এ প্রক্রিয়ায় খরচ সাশ্রয়ের তুলনায় সরবরাহ স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। কিন্তু স্থিতিশীলতার জন্য খরচ এক ধরনের বীমা পলিসির মতো কাজ করে। সরবরাহ চেইনের দুর্বলতার বিকল্প কোনো ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে স্থিতিশীল রাখার এ খরচ ভবিষ্যতে কমবে না। এখানে প্রধান ঝুঁকি হলো, একটি বড় সরবরাহ চেইনের ওপর বৈশ্বিক নির্ভরশীলতা।
সাম্প্রতিক প্রযুক্তির ধারা নিয়েও এ সময় মন্তব্য করেন দিলহান পিল্লাই। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিটি ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিস্তৃত প্রভাব ফেলছে।’
অবশ্য বিশ্বায়নের বর্তমান অবস্থা সতর্কবার্তা নতুন নয়। মুক্ত বাণিজ্যের কারণে বিশ্বায়নের যে চেহারা দাঁড়িয়েছে তা সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে বলে গত মার্চে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক বহুজাতিক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসির চেয়ারম্যান স্যার মার্ক টাকার। বিশ্বায়নের বিপরীতে বর্তমান বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক মেরুকরণের যে ধারা দেখা যাচ্ছে তা আগামীতে অব্যাহত থাকবে বলেও মনে করেন তিনি।
হংকংয়ে এইচএসবিসির বৈশ্বিক বিনিয়োগ সম্মেলনে মার্ক টাকার বলেন, ‘অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বোত্তম ও দক্ষ সরবরাহ চেইন গঠনের কারণে বিপুল পরিমাণে সম্পদ সৃষ্টি হয়েছিল, তা পৃথিবীতে অন্যতম বৃহত্তম সমৃদ্ধি যুগের সূচনা করেছে। ফলে অর্থনৈতিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তন হয়েছে এবং যা একসময় টেকসই ছিল তা এখন আর নয়।’